পৃষ্ঠাসমূহ

সোমবার, ৮ জুলাই, ২০১৩

মত প্রকাশের স্বাধীনতা সামপ্রতিক বিতর্ক এবং সাংবাদিকের মানবাধিকার



বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয়ভাগ মৌলিক অধিকারের সাথে সম্পর্কিত। মৌলিক অধিকারের মধ্যে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক স্বাধীনতা অন্যতম। মৌলিক অধিকারের সাথে সামঞ্জস্যহীন আইন বাতিল ঘোষণা করে সংবিধানের ২৬ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, "এই ভাগের বিধানাবলীর সহিত অসামঞ্জস্য সকল প্রচলিত আইন যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, এই সংবিধান-প্রবর্তন হইতে সেই সকল আইনের ততখানি বাতিল হইয়া যাইবে।" ইদানীং উচ্চ আদালতের একটি সিদ্ধান্ত সাংবাদিক সমাজের মাঝে ােভের সঞ্চার করেছে।


হাইকোটের্র একটি বেঞ্চ সমপ্রতি সংগঠিত সাংবাদিক দম্পতি হত্যার তদন্ত প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে এমন সংবাদ পরিবেশন বন্ধ করতে তথ্যসচিবকে নির্দেশ প্রদান করে। সংবাদ পরিবেশন সম্পর্কে এ ধরনের নির্দেশনাকে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রতি হুমকি বলে মনে করেন সাংবাদিকরা। সাংবাদিকদের এক সমাবেশে বিশিষ্ট সাংবাদিক মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল এ ধরনের হস্তপেকে নজিরবিহীন বলে অভিহিত করেছেন। সাংবাদিকদের নিজেদের একটি অংশেরও অবশ্য এই সংকট সৃষ্টিতে ভূমিকা আছে। হত্যাকা-ের পরপরই শিশুর কাছ থেকে ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ আদায়ে এক শ্রেণীর সাংবাদিকদের প্রচেষ্টা অত্যন্ত দৃষ্টিকটু ঠেকেছে। পৃথিবীর কোথাও যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার কার্যক্রম পরিচালনা করার নজির নেই। ডেভিড বার্গম্যান আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার কার্যক্রম চলাকালে অন্যান্য যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যপদ্ধতি তুলে ধরেন। অভিযুক্তের প েতার আইনজীবীরা যুগোশ্লাভিয়া, রুয়ান্ডা, কসোভো এবং কম্বোডিয়ার যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের উদাহরণ টেনে বলেন, যতো কঠোর সমালোচনাই হোক না কেন শুধু সমালোচনার জন্য সমালোচকদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের কোন নজির নেই। কোন কিছুতেই কাজ হয়নি। ট্রাইব্যুনাল ওই প্রতিবেদনে ৪ টি প্যারাগ্রাফের মধ্যে ২টি আদালত অবমাননাকর বলে মনে করেছেন তথাপি নূরুল কবির এবং বার্গম্যান সহ সবাইকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

নিকট অতীতে মিডিয়া এবং আদালতের মধ্যে সংবাদ পরিবেশন নিয়ে বেশকিছু ঘটনার জন্ম হয়েছে। তার মধ্যে নিউ এজ পত্রিকার বিরুদ্ধে চলা আদালত অবমাননার মামলা উল্লেখযোগ্য। ২০১১ সালের ২ অক্টোবর ইংরেজি দৈনিক নিউ এজে 'এ ক্রুসিয়াল পিরিয়ড ফর আইসিটি' শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ট্রাইব্যুনাল মনে করে প্রতিবেদনটি মানুষের কাছে ট্রাইব্যুনালের ভাবমূর্তি ুন্ন করার জন্য করা হয়েছে।বাংলাদেশের আইন ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রায় প্রতি বছরই বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংগঠন তাদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। এসব প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রকাশিত হয় দেশের বিগত বছরের সার্বিক মানবাধিকার ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র, একই সাথে এসব প্রতিবেদন দেশে আইনের শাসন ও মানবাধিকার বিষয়ক সচেতনতা সৃষ্টিতে ইতিবাচক অবদান রাখছে।

এ প্রতিবেদনগুলো জনসম েপ্রকাশ ও প্রচারের ফলে সমাজে আইন ও মানবাধিকার বিষয়ক সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি সরকারের উপর এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করে যাতে সরকার দেশে আইনের শাসন ও মানবাধিকার রায় আরো বেশি উদ্যোগী হয়। আমাদের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদটি ভারতের সংবিধানের ১৯ অনুচ্ছেদের অনুরূপ। সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের অনুচ্ছেদ ১৯-এ মত এবং বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার স্বীকৃতি রয়েছে এবং এ অধিকার কোন রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে আবদ্ধ নয়। আমাদের দেশে সাংবাদিক নির্যাতনের ব্যাপকতা অনেক বেশি। বেশি এ কারণে যে, এখানে মতার ছত্রছায়ায় কখনো কখনো সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনাগুলো ঘটে থাকে। মিরপুরে কামাল আহমেদ মজুমদার কর্তৃক সাংবাদিক মারধর এরই ধারাবাহিকতা। আবার যেসব দেশে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ নির্যাতনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় তখন রাষ্ট্র তার দায় এড়াতে পারে না। স্বৈরশাসকের আমলে সাংবাদিক নির্যাতনের হার ছিল সবচেয়ে বেশি। গণতন্ত্রকে হত্যা করতে হলে আগে সাংবাদিকের মানবাধিকার হরণ করতে হয়-স্বৈরাশাসকদের এ কথা ভালোই জানা । কিন্তু এখনতো দেশে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত। তারপরও কেন সাংবাদিকের মানবাধিকার হরণ? এছাড়া উক্ত মানবাধিকার ঘোষণার অনুচ্ছেদ ১৮-তে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার অধিকার স্বীকৃত।

রাষ্ট্রীয় ও আনর্্তজাতিক আইনে সংবাদপত্রের অধিকার, মানুষের স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অধিকারসহ সকল পেশায় নিয়োজিত জনগণের অধিকার স্বীকৃত থাকলেও বাস্তবে সাংবাদিকদের নানাভাবেই নির্যাতনের শিকার হতে হয়, যা কি না আইনের শাসনের পরিপন্থী ও গুরুতর মানবাধিকার লংঘন। আমরা আশা করি, ২০১১-এ যেসব সাংবাদিক তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তাদের েেত্র ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে এবং ২০১২ সালে আর কোনো সাংবাদিকের মানবাধিকার হরণ করা হবে না। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গেলে, মানুষের অধিকারের কথা বলতে গেলে, আইনের শাসনের কথা বলতে গেলে, দুর্নীতির কথা ফাঁস করলে যাদের স্বার্থহানি হয়, সেই স্বার্থান্বেষী মহল স্বাভাবিকভাবেই সাংবাদিক-মানবাধিকারকমীদের্র উপর চড়াও হবে এটাই স্বাভাবিক। সমগ্র বিশ্বেই যখন এ অবস্থা তখন বাংলাদেশতো আর তার ব্যাতিক্রম নয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনা কোনো নতুন বিষয় নয়। সাংবাদিকতাই সম্ভবত একমাত্র পেশা যেখানে মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা সবচেয়ে বেশি। কিন্তু পৃথিবীর যেখানেই আইনের শাসন ও মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা ঘটে সেখানেই সবার আগে পৌঁছে যান যে মানুষটি তিনি আর কেউ নন-একজন সাংবাদিক। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যিনি সংবাদ সংগ্রহের পাশাপাশি ঐ বঞ্চিত মানুষটির পাশে দাঁড়ান তিনি আর কেউ নন-একজন সাংবাদিক, একজন সংবাদকর্মী। মানুষের দুঃখ-কষ্ট-বেদনার কথা যিনি সবাইকে জানিয়ে দেন, যিনি মানুষকে আহ্বান করেন মানুষের পাশে দাঁড়াতে, তিনি সাংবাদিক। কাজেই মানবাধিকার লংঘনের ঘটনায় সাংবাদিকরাই প্রথম মানবাধিকার কর্মী। সাংবাদিকের মানবাধিকার আসলে মানুষের মত প্রকাশের অধিকারের সাথেই সম্পৃক্ত। মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানুষের মৌলিক অধিকার। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সংবিধানের মতো আমাদের সংবিধানেও মত প্রকাশের অধিকার মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে দেশের প্রত্যেকটি নাগরিকের চিন্তা, মত ও বিবেকের স্বাধীনতার স্বীকৃতি রয়েছে। রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক না স্বৈরাচারী তার একটি অন্যতম মাপকাঠি হলো রাষ্ট্রে মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে কি না। তাই বলা হয়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ছাড়া গণতন্ত্র হয় না (ফরিদ আহমেদ বনাম পশ্চিম পাকিস্তান, পিএলডি, ১৯৬৫)। সংবিধানের ৩৯(১) অনুচ্ছেদে যথাযথভাবেই কোনো শর্ত আরোপ করে ছাড়াই চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু অনুচ্ছেদ ৩৯ (২)-এ কিছু শর্ত সাপে েবাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা রয়েছে। একই শর্তসাপে েসংবাদপত্রের স্বাধীনতার অধিকারও নিশ্চিত করা হয়েছে। ভারতের সংবিধানে যে শর্তগুলো আরোপ করা হয়েছে আমাদের দেশেও সে শর্তগুলোই আরোপ করা হয়েছে। শর্তগুলো হলো-রাষ্ট্রর নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বর্পূণ সমর্্পক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও নৈতিকতা কিংবা আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা সমর্্পকে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ।
২০১১ সালের মানবাধিকার প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে দেখা যায় : শুধু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারাই বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিক নির্যাতন, হুমকি, হয়রানি ও মামলার শিকার প্রাণনাশের হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন সন্ত্রাসী কর্তৃক নির্যাতন, হামলা, হয়রানি ও বোমা নিেেপর মুখোমুখি হয়েছেন সরকারি দল ও তার অঙ্গসংগঠন কর্তৃক হামলা, হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন প্রকাশিত সংবাদের জন্য মামলা হয়েছে সরকারি কর্মকর্তা কর্তৃক নির্যাতন, হুমকি ও হয়রানির শিকার বিএনপি ও তার অঙ্গ সংগঠন কর্তৃক হামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন সন্ত্রাসী কর্তৃক খুন হয়েছেন অন্যান্যভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৫০ সাংবাদিক ৩১ সাংবাদিক ৫০ সাংবাদিক ৪৭ সাংবাদিক ৬৯ টি ১৮ জন সাংবাদিক ১৮ জন সাংবাদিক ১ জন সাংবাদিক ৩২ সাংবাদিক অর্থাৎ দেশজুড়ে প্রায় তিন শতাধিক সাংবাদিক নানাভাবে মানবাধিকার লংঘন বা হুমকির শিকার হয়েছেন। এর বাইরেও একটি বিরাট অংশ তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে নানাভাবেই বাধার সম্মুখীন হয়েছেন।
Everyone has the right to freedom of opinion and expression; this right includes freedom to hold opinions without interference and to seek, receive and impart information and ideas through any media and regardless of frontiers Article-19 of Constitution of Peoples` Republic of Bangladesh.

দেশে দেশে গণমানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর যেমন বিভিন্ন সময়ে খড়গ নেমে এসেছে, তেমনি রাষ্ট্র কতৃর্ক মানুষের এ অধিকারের স্বীকৃতির ইতিহাসও কম দীর্ঘ নয়। পৃথিবীর যেসব দেশ প্রথম সংবাদপত্রের স্বাধীনতার স্বীকৃতি দিয়েছে তাদের মধ্যে সুইডেন, ফিনল্যান্ড, পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া, ডেনমার্ক ও নরওয়ে অন্যতম।


তথ্যসূত্র:
১. আদালত অবমাননা মামলায় নূরুল কবীর, বার্গম্যানের অব্যাহতি, ২. সাগর-রুনি হত্যা নিয়ে খালেদা জিয়ার বক্তব্য সম্পর্কে হাইকোর্ট; মন্তব্যটি দায়িত্বহীন, ৩. গণমাধ্যমে নাক গলাবেন না: আদালতকে বুলবুল, ৪. ডেভিড বার্গম্যান/ বাংলাদেশ ওয়ার ক্রাইমস,
 Wednesday, March 14, 2012 at 3:29pm
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Google+ Badge

send or tell a frind

voice of the protestant


take a look!

Translate

Sayed Taufiq Ullah